সিরাতুল মুস্তাকিম অ্যাপ ডাউনলোড করুনGoogle Play
الٓرۚ تِلۡكَ ءَايَٰتُ ٱلۡكِتَٰبِ ٱلۡحَكِيمِ
অর্থ: আলিফ-লাম-রা। এগুলো সুদৃঢ় (সুস্পষ্ট) কিতাবের আয়াত।
তাফসীর: ১. আলিফ-লাম-রা। সূরা বাক্বারার শুরুতে এ জাতীয় বিচ্ছিন্ন বর্ণমালার ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। এ সূরার পঠিতব্য আয়াতগুলো সুগঠিত হিকমতপূর্ণ কুর‘আনের আয়াত যা হিকমত ও বিধানাবলী সম্বলিত।
أَكَانَ لِلنَّاسِ عَجَبًا أَنۡ أَوۡحَيۡنَآ إِلَىٰ رَجُلٖ مِّنۡهُمۡ أَنۡ أَنذِرِ ٱلنَّاسَ وَبَشِّرِ ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَنَّ لَهُمۡ قَدَمَ صِدۡقٍ عِندَ رَبِّهِمۡۗ قَالَ ٱلۡكَٰفِرُونَ إِنَّ هَٰذَا لَسَٰحِرٞ مُّبِينٌ
অর্থ: এটা কি মানুষের জন্য আশ্চর্যের বিষয় যে, আমি তাদের মধ্য থেকেই একজনের কাছে অহী প্রেরণ করেছি এ মর্মে যে, ‘তুমি মানুষকে (আল্লাহর শাস্তি থেকে) সতর্ক করো এবং মু’মিনদেরকে এ সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য তাদের রবের কাছে রয়েছে উঁচু মর্যাদা।’ (এর পরিপ্রেক্ষিতে) কাফিররা বলতে লাগলো: ‘এ তো এক সুস্পষ্ট যাদুকর!’
তাফসীর: ২. মানুষের নিকট কি এটি এতো আশ্চর্যের বিষয় হয়ে গেলো যে, আমি তাদের মতো একজন মানুষের উপর ওহী নাযিল করেছি?! আমি তাঁকে আদেশ করেছি তাদেরকে আল্লাহর শাস্তির ভয় দেখানোর জন্য। হে রাসূল! আপনি মু’মিনদেরকে এ ব্যাপারে খুশির সংবাদ দিন যে, তারা যে নেক আমল পাঠাবে তার প্রতিদান স্বরূপ তাদের প্রতিপালকের নিকট তাদের জন্য রয়েছে উঁচু স্থান। কাফিররা বললো: নিশ্চয়ই তোমাদের নিকট এ আয়াতগুলো আনয়নকারী প্রকাশ্য যাদুকর।
إِنَّ رَبَّكُمُ ٱللَّهُ ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٖ ثُمَّ ٱسۡتَوَىٰ عَلَى ٱلۡعَرۡشِۖ يُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَۖ مَا مِن شَفِيعٍ إِلَّا مِنۢ بَعۡدِ إِذۡنِهِۦۚ ذَٰلِكُمُ ٱللَّهُ رَبُّكُمۡ فَٱعۡبُدُوهُۚ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ
অর্থ: ‘নিশ্চয় তোমাদের রব হলেন সেই আল্লাহ, যিনি আসমানসমূহ ও জমিন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, তারপর তিনি ‘আরশের ওপর উঠলেন। তিনি সব বিষয় একাই সিদ্ধান্ত নেন ও পরিচালনা করেন। তাঁর অনুমতি ব্যতীত কোন সুপারিশকারী সুপারিশ করতে পারে না। তিনিই আল্লাহ, তোমাদের রব। সুতরাং তোমরা (একনিষ্ঠভাবে) তাঁরই ইবাদত করো। (তাঁর একত্ববাদের ওপর এতো দলিল-প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও) তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?
তাফসীর: ৩. হে আশ্চর্যান্বিতরা! নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক হলেন আল্লাহ যিনি বড় বড় আকাশগুলোকে এবং এ প্রশস্ত জমিনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। এরপর তিনি আরশের উপর সুউচ্চ ও সমুন্নত হন। তোমরা কীভাবে আশ্চর্য হও তোমাদের মধ্যকার একজনকে রাসূল বানানোর দরুন?! তিনি তাঁর প্রশস্ত মালিকানায় একাই ফায়সালা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কারো কোন অধিকার নেই কোন বিষয়ে তাঁর নিকট সুপারিশ করার সুপারিশকারীর প্রতি তাঁর সন্তুষ্টি ও সুপারিশের অনুমতি ছাড়া। এ সকল বৈশিষ্ট্যের অধিকারীই হলেন তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ। তাই তোমরা খাঁটিভাবে শুধু তাঁরই ইবাদত করো। তাঁর একত্ববাদের উপর এতো দলীল-প্রমাণ থাকা সত্তে¡ও তোমরা সেগুলো থেকে উপদেশ গ্রহণ করছো না? যার সামান্যটুকু উপদেশ গ্রহণের যোগ্যতা রয়েছে সে অবশ্যই তা বুঝবে ও তাঁর উপর ঈমান আনবে।
إِلَيۡهِ مَرۡجِعُكُمۡ جَمِيعٗاۖ وَعۡدَ ٱللَّهِ حَقًّاۚ إِنَّهُۥ يَبۡدَؤُاْ ٱلۡخَلۡقَ ثُمَّ يُعِيدُهُۥ لِيَجۡزِيَ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّٰلِحَٰتِ بِٱلۡقِسۡطِۚ وَٱلَّذِينَ كَفَرُواْ لَهُمۡ شَرَابٞ مِّنۡ حَمِيمٖ وَعَذَابٌ أَلِيمُۢ بِمَا كَانُواْ يَكۡفُرُونَ
অর্থ: (কিয়ামতের দিন) তাঁরই কাছে তোমাদের সকলকে ফিরে যেতে হবে।(১) আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। তিনিই (পূর্বের নমুনা ব্যতীত) সৃষ্টিকে প্রথম অস্তিত্বে আনেন, মৃত্যুর পর তিনি আবার তাকে সৃষ্টি করবেন, যাতে যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদেরকে ইনসাফপূর্ণ প্রতিদান দিতে পারেন। আর যারা কুফরি করেছে তাদের জন্য রয়েছে, অত্যন্ত গরম পানীয় (যা তাদের নাড়িভুঁড়ি ছিঁড়ে ফেলবে)। উপরন্তু (আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের সাথে) কুফরি করার কারণে তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
তাফসীর: ৪. কিয়ামতের দিন শুধু তাঁর কাছেই তোমাদেরকে ফিরে যেতে হবে। যাতে তিনি তোমাদেরকে তোমাদের আমলগুলোর প্রতিদান দিতে পারেন। আল্লাহ তা‘আলা মানুষের সাথে এ ব্যাপারে সত্য ওয়াদা করেছেন। যার কখনো ব্যত্যয় হবে না। নিশ্চয়ই তিনি তা করতে সক্ষম। তিনি পূর্বের বিনা নমুনায় তাঁর সৃষ্টির সূচনা করেন। মৃত্যুর পর তিনি আবার তাকে সৃষ্টি করবেন। যাতে তিনি আল্লাহতে বিশ্বাসী ও নেক আমলকারীদেরকে ইনসাফপূর্ণ প্রতিদান দিতে পারেন। তাদের কোন সাওয়াব না হ্রাস হবে। না গুনাহ বাড়িয়ে দেয়া হবে। আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের সাথে কুফরিকারীদের জন্য পানীয় হিসেবে রয়েছে অত্যন্ত গরম পানি। যা তাদের নাড়িভুঁড়ি ছিঁড়ে ফেলবে। উপরন্তু আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের সাথে কুফরির কারণে তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
(১) যাতে তিনি তোমাদেরকে তোমাদের আমলের প্রতিদান দিতে পারেন।
هُوَ ٱلَّذِي جَعَلَ ٱلشَّمۡسَ ضِيَآءٗ وَٱلۡقَمَرَ نُورٗا وَقَدَّرَهُۥ مَنَازِلَ لِتَعۡلَمُواْ عَدَدَ ٱلسِّنِينَ وَٱلۡحِسَابَۚ مَا خَلَقَ ٱللَّهُ ذَٰلِكَ إِلَّا بِٱلۡحَقِّۚ يُفَصِّلُ ٱلۡأٓيَٰتِ لِقَوۡمٖ يَعۡلَمُونَ
অর্থ: তিনিই সূর্যকে করেছেন দীপ্তিমান ও চাঁদকে আলোকময় এবং তার জন্য মনযিল(১) নির্দিষ্ট করেছেন, যাতে তোমরা (চন্দ্র ও সূর্যের মাধ্যমে) বছর গণনা ও সময়ের হিসাব জানতে পারো। আল্লাহ এগুলোকে (অনর্থকভাবে নয়; বরং) উদ্দেশ্যমূলকভাবেই সৃষ্টি করেছেন। তিনি জ্ঞানীদের জন্যে এসব নিদর্শন বিশদভাবে বর্ণনা করেন।
তাফসীর: ৫. তিনি সূর্যকে বানিয়েছেন তেজোদীপ্তির বিচ্ছুরণ ও বিকিরণকারী। আর চন্দ্রকে আলোকময় করে। উপরন্তু তার গতিকে নির্ধারণ করেছেন তার আটাশটি মঞ্জিলের সংখ্যানুপাতে। মঞ্জিল বলতে সেই দূরত্বকে বুঝানো হয় যা চন্দ্র প্রতি দিন ও রাতে অতিক্রম করে। হে মানুষ সকল! যাতে তোমরা সূর্যের মাধ্যমে দিনের সংখ্যা এবং চন্দ্রের মাধ্যমে মাস ও বছরের সংখ্যা জানতে পারো। আল্লাহ তা‘আলা আসমান-জমিন ও এতদুভয়ের মাঝের সবকিছু অনর্থক সৃষ্টি করেন নি। বরং তা মানুষের সামনে তাঁর ক্ষমতা ও বড়ত্বের প্রকাশ ঘটানোর জন্য করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর একত্ববাদের পরিষ্কার ও সুস্পষ্ট দলীল ও প্রমাণাদির মাধ্যমে তাঁর একত্ববাদের প্রমাণ গ্রহণ করতে জানা সম্প্রদায়ের জন্য তা বর্ণনা করেছেন।
(১) আটাশটি মনযিল রয়েছে। মনযিল বলতে সেই দূরত্বকে বুঝানো হয়, যে অন্তর্বর্তী স্থান চন্দ্র প্রতি দিন ও রাতে অতিক্রম করে।
إِنَّ فِي ٱخۡتِلَٰفِ ٱلَّيۡلِ وَٱلنَّهَارِ وَمَا خَلَقَ ٱللَّهُ فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ لَأٓيَٰتٖ لِّقَوۡمٖ يَتَّقُونَ
অর্থ: নিশ্চয় দিন ও রাতের আবর্তনে(২) এবং আল্লাহ আসমানসমূহ ও জমিনে যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তাতে নিদর্শন রয়েছে, আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মান্যকারী মুত্তাকী সম্প্রদায়ের জন্য।
তাফসীর: ৬. বান্দার উপর রাত ও দিনের আবর্তন এবং রাতের অন্ধকার ও দিনের আলো রাত-দিনের ছোট-বড় হওয়া, আসমান ও জমিনের তাঁর সকল সৃষ্টি আল্লাহর ক্ষমতা বুঝায় এমন সব আলামত। আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মান্যকারী মুত্তাকী সম্প্রদায়ের জন্য।
(২) অর্থাৎ রাতের অন্ধকার ও দিনের আলো, রাত-দিনের ছোট-বড় হওয়া ইত্যাদি পরিবর্তনে।
إِنَّ ٱلَّذِينَ لَا يَرۡجُونَ لِقَآءَنَا وَرَضُواْ بِٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَا وَٱطۡمَأَنُّواْ بِهَا وَٱلَّذِينَ هُمۡ عَنۡ ءَايَٰتِنَا غَٰفِلُونَ
অর্থ: নিশ্চয় যারা আমার সাক্ষাতের আশা পোষণ করে না, (আখিরাতের স্থায়ী জীবনের পরিবর্তে) দুনিয়ার জীবন নিয়েই সন্তুষ্ট হয়েছে এবং এতেই পরিতৃপ্ত থাকে, আর যারা আমার নিদর্শনাবলি সম্পর্কে গাফিল।
তাফসীর: ৭. যে সব কাফির এবং আল্লাহ তা‘আলার দলীল ও নিদর্শনসমূহ থেকে গাফিল ও মুখ ফিরিয়ে নেয়া ব্যক্তি আল্লাহর সাক্ষাতের আশা করে না, যাতে তারা তাঁকে ভয় করে ও তাঁর প্রতি আগ্রহী হয় এবং আখিরাতের স্থায়ী জীবনের পরিবর্তে দুনিয়ার নশ্বর জীবনে সন্তুষ্ট হয়। উপরন্তু তার প্রতি খুশিতে তাদের অন্তরগুলো প্রশান্ত হয়।
أُوْلَٰٓئِكَ مَأۡوَىٰهُمُ ٱلنَّارُ بِمَا كَانُواْ يَكۡسِبُونَ
অর্থ: তাদের কৃতকর্মের কারণে তাদের আবাসস্থল হবে জাহান্নাম।
তাফসীর: ৮. কুফরি অর্জন এবং কিয়ামতের দিবসকে অস্বীকার করার কারণে এ সকল বৈশিষ্ট্যের অধিকারীদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম। যাতে তারা আশ্রয় গ্রহণ করবে।
إِنَّ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّٰلِحَٰتِ يَهۡدِيهِمۡ رَبُّهُم بِإِيمَٰنِهِمۡۖ تَجۡرِي مِن تَحۡتِهِمُ ٱلۡأَنۡهَٰرُ فِي جَنَّٰتِ ٱلنَّعِيمِ
অর্থ: নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদের রব তাদের ঈমান আনার কারণে তাদেরকে উত্তম আমলের পথ দেখান, (যা তাদেরকে আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে পৌঁছিয়ে দেয়)। উপরন্তু আল্লাহ তাদেরকে (কিয়ামতের দিন) নিয়ামতে ভরপুর স্থায়ী জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যেখানে তাদের তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হবে, নদ-নদী-ঝর্ণাধারা।
তাফসীর: ৯. আল্লাহতে বিশ্বাসী ও নেককারদেরকে আল্লাহ তা‘আলা তাদের ঈমানের দরুন নেক আমলের পথ দেখান। যা তাদেরকে আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে পৌঁছিয়ে দিবে। উপরন্তু আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে কিয়ামতের দিন স্থায়ী নিয়ামতের জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। যেখানে তাদের তলদেশ দিয়ে অনেকগুলো নদী প্রবাহিত হবে।
دَعۡوَىٰهُمۡ فِيهَا سُبۡحَٰنَكَ ٱللَّهُمَّ وَتَحِيَّتُهُمۡ فِيهَا سَلَٰمٞۚ وَءَاخِرُ دَعۡوَىٰهُمۡ أَنِ ٱلۡحَمۡدُ لِلَّهِ رَبِّ ٱلۡعَٰلَمِينَ
অর্থ: সেখানে (জান্নাতে) তাদের দু‘আ হবে: ‘সুবহানাকাল্লাহুম্মা’ (হে আল্লাহ! আপনি মহান, পবিত্র।) এবং সেখানে তাদের অভিবাদন হবে: ‘সালাম’ (শান্তি ও নিরাপত্তা হোক!) আর তাদের দু‘আর পরিসমাপ্তি হবে: ‘আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল ‘আলামীন!’
তাফসীর: ১০. জান্নাতে তাদের দু‘আ হবে তাসবীহ ও আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করা। তাদের জন্য আল্লাহ, ফিরিশতা এবং তাদের একের জন্য অপরের সম্ভাষণ হবে সালাম। আর তাদের দু‘আর পরিসমাপ্তি হবে সকল সৃষ্টির প্রতিপালক আল্লাহর প্রশংসা দিয়ে।
অনুবাদ: রুওয়াদ অনুবাদ সেন্টার। তাফসীর: তাফসীর সেন্টার ফর কুরআনিক স্টাডিজ। উৎস QuranEnc.