সিরাতুল মুস্তাকিম অ্যাপ ডাউনলোড করুনGoogle Play
يَسۡـَٔلُونَكَ عَنِ ٱلۡأَنفَالِۖ قُلِ ٱلۡأَنفَالُ لِلَّهِ وَٱلرَّسُولِۖ فَٱتَّقُواْ ٱللَّهَ وَأَصۡلِحُواْ ذَاتَ بَيۡنِكُمۡۖ وَأَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥٓ إِن كُنتُم مُّؤۡمِنِينَ
অর্থ: লোকেরা তোমাকে আনফাল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে। তুমি বলো: ‘যুদ্ধলব্ধ সম্পদ আল্লাহ ও রাসূলের জন্যে।(১) সুতরাং তোমরা আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে তাঁকেই ভয় করো এবং পরস্পরের মধ্যকার অবস্থা সংশোধন করে নাও। আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো; যদি তোমরা মু’মিন হও।’
তাফসীর: ১. হে রাসূল! আপনার সাথীরা আপনাকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে সেটির বন্টন কী ধরনের হবে? এবং কারা কারা সে সম্পদের অধিকারী হবে? হে রাসূল! আপনি তাদের প্রশ্নের উত্তরে বলুন: যুদ্ধলব্ধ সম্পদগুলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য। এর বন্টন ও ব্যবহারের ক্ষমতা কেবল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্যই। তোমাদের কাজ হবে শুধু তা মেনে নেয়া ও তার সামনে মাথা নত করা। হে মু’মিনরা! তোমরা আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে তাঁকেই ভয় করো। আর তোমাদের নিজেদের পারস্পরিক সম্পর্ককে বিনষ্ট না করে ভালোবাসা, পারস্পরিক যোগাযোগ, সচ্চরিত্র ও ক্ষমার মাধ্যমে দৃঢ় ও মজবুত করার চেষ্টা করো। তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যকে আঁকড়ে ধরো যদি তোমরা সত্যিকারার্থে মু’মিন হয়ে থাকো। কারণ, ঈমান বস্তুতঃ আনুগত্যে উৎসাহিত ও গুনাহ থেকে দূরে রাখে। উপরোক্ত প্রশ্নটি মূলতঃ বদরের যুদ্ধের পরপরই করা হয়েছিলো।
(১) অর্থাৎ এর বণ্টন ও ব্যবহারের ক্ষমতা কেবল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্যই।
إِنَّمَا ٱلۡمُؤۡمِنُونَ ٱلَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ ٱللَّهُ وَجِلَتۡ قُلُوبُهُمۡ وَإِذَا تُلِيَتۡ عَلَيۡهِمۡ ءَايَٰتُهُۥ زَادَتۡهُمۡ إِيمَٰنٗا وَعَلَىٰ رَبِّهِمۡ يَتَوَكَّلُونَ
অর্থ: মু’মিন তো তারাই, যাদের সামনে আল্লাহকে স্মরণ করা হলে, তাদের অন্তর কেঁপে উঠে এবং তাঁর আয়াতসমূহ তাদের কাছে তিলাওয়াত করা হলে, তা তাদের ঈমান বর্ধিত করে। আর তারা তাদের রবের ওপরই নির্ভর করে।
তাফসীর: ২. সত্যিকার ঈমানদার ওরা যাদের সামনে আল্লাহকে স্মরণ করা হলে তাদের অন্তরগুলো ভয়ে কেঁপে উঠে অতঃপর তাদের হৃদয় ও শরীর আনুগত্যের জন্য তৈরি হয়ে যায়। যখন তাদের নিকট আল্লাহর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করা হয় তখন তারা সেগুলোকে নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে। ফলে তাদের ঈমান উত্তরোত্তর বেড়ে যায়। আর তারা নিজেদের কল্যাণের অন্বেষণে এবং অকল্যাণ ও পাপাচার থেকে বাঁচার জন্য একমাত্র তাদের প্রতিপালকের উপরই ভরসা করে থাকে।
ٱلَّذِينَ يُقِيمُونَ ٱلصَّلَوٰةَ وَمِمَّا رَزَقۡنَٰهُمۡ يُنفِقُونَ
অর্থ: যারা সালাত কায়ম করে এবং আমি তাদেরকে যা রিযক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে।
তাফসীর: ৩. যারা সময় মতো পরিপূর্ণ পদ্ধতিতে সর্বদা সালাত আদায় করে থাকে। আর আমি তাদেরকে যা রিযিক দিয়েছি তা থেকে বাধ্যতামূলভাবে এবং স্বেচ্ছায় দান করে।
أُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ حَقّٗاۚ لَّهُمۡ دَرَجَٰتٌ عِندَ رَبِّهِمۡ وَمَغۡفِرَةٞ وَرِزۡقٞ كَرِيمٞ
অর্থ: তারাই প্রকৃত মু’’মিন। তাদের রবের কাছে তাদের জন্যে রয়েছে সুউচ্চ মর্যাদাসমূহ, ক্ষমা এবং সম্মানজনক রিযক।
তাফসীর: ৪. এ বৈশিষ্ট্যাবলীর অধিকারীরা সত্যিকারার্থেই মু’মিন। কারণ, তাদের মাঝে ঈমান ও ইসলামের প্রকাশ্য গুণাবলীর সমন্বয় ঘটেছে। তাদের প্রতিদান হবে নিজেদের প্রতিপালকের নিকট সুউচ্চ অট্টালিকা, গুনাহের ক্ষমা ও সম্মানজনক রিযিক। যা আল্লাহ তা‘আলা তাদের জন্য নিয়ামত স্বরূপ তৈরি করে রেখেছেন।
كَمَآ أَخۡرَجَكَ رَبُّكَ مِنۢ بَيۡتِكَ بِٱلۡحَقِّ وَإِنَّ فَرِيقٗا مِّنَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ لَكَٰرِهُونَ
অর্থ: এটা এমন(২), যেভাবে তোমার রব তোমাকে ন্যায়ভাবে নিজ ঘর থেকে বের করেছিলেন; অথচ মু’মিনদের এক দল তা অপছন্দ করেছিল।
তাফসীর: ৫. যুদ্ধলব্ধ সম্পদের বন্টন নিয়ে তোমাদের মাঝে দ্ব›দ্ব-বিগ্রহের পর আল্লাহ তা‘আলা আপন ক্ষমতা বলে বন্টনের বিষয়টি নিজের ও তদীয় রাসূলের হাতে ন্যস্ত করলেন এভাবেই হে রাসূল! আপনার প্রতিপালক আপনাকে ওহীর মাধ্যমে মদীনা থেকে বের করে মুশরিকদের মুখোমুখী দাঁড় করালেন। অথচ মু’মিনদের একদল লোক তখনো তা দারুনভাবে অপছন্দ করছিলো।
(২) অর্থাৎ যুদ্ধলব্ধ সম্পদের বণ্টন নিয়ে তোমাদের মাঝে দ্বন্দ্ব-বিগ্রহের পর আল্লাহ আপন ক্ষমতা বলে বণ্টনের বিষয়টি নিজের ও তাঁর রাসূলের হাতে ন্যস্ত করলেন এভাবেই।
يُجَٰدِلُونَكَ فِي ٱلۡحَقِّ بَعۡدَ مَا تَبَيَّنَ كَأَنَّمَا يُسَاقُونَ إِلَى ٱلۡمَوۡتِ وَهُمۡ يَنظُرُونَ
অর্থ: সত্য(৩) স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হওয়ার পরও তারা তোমার সাথে বিতর্ক করছে। যেন তাদেরকে মৃত্যুর দিকে হাঁকিয়ে নেয়া হচ্ছে, আর তারা তা দেখছে।
তাফসীর: ৬. হে রাসূল! মু’মিনদের এ দলটির নিকট মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ অবধারিত হওয়ার ব্যাপারটি সুস্পষ্ট হওয়ার পরও তারা আপনার সাথে ঝগড়া করেছে। যেন এর মাধ্যমে তাদেরকে মৃত্যুর দিকে হাঁকিয়ে নেয়া হচ্ছে আর তারা তা সচক্ষে দেখতে পাচ্ছে। কারণ, তারা যুদ্ধের জন্য বের হওয়াকে কঠিনভাবে অপছন্দ করছিলো। তারা এর জন্য কোনভাবেই প্রস্তুত ছিলো না।
(৩) এখানে ‘হক’ বলতে যুদ্ধ বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ অবধারিত হওয়ার ব্যাপারটি সুস্পষ্ট হওয়ার পরও তারা তোমার সাথে ঝগড়া করেছে।
وَإِذۡ يَعِدُكُمُ ٱللَّهُ إِحۡدَى ٱلطَّآئِفَتَيۡنِ أَنَّهَا لَكُمۡ وَتَوَدُّونَ أَنَّ غَيۡرَ ذَاتِ ٱلشَّوۡكَةِ تَكُونُ لَكُمۡ وَيُرِيدُ ٱللَّهُ أَن يُحِقَّ ٱلۡحَقَّ بِكَلِمَٰتِهِۦ وَيَقۡطَعَ دَابِرَ ٱلۡكَٰفِرِينَ
অর্থ: আর তোমরা স্মরণ করো, যখন আল্লাহ তোমাদেরকে দু’দলের একটির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, নিশ্চয় তা তোমাদের আয়ত্তাধীন হবে। আর তোমরা কামনা করছিলে যে, নিরস্ত্র দলটি তোমাদের আয়ত্তাধীন হোক। কিন্তু আল্লাহ চাচ্ছিলেন যে, তিনি তাঁর বাণীসমূহের মাধ্যমে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করবেন এবং কাফিরদেরকে নির্মূল করবেন।
তাফসীর: ৭. হে ঝগড়াকারী মু’মিনরা! তোমরা সে সময়ের কথা স্মরণ করো যখন আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের সাথে এ ওয়াদা করেছেন যে, তিনি অচিরেই তোমাদেরকে মুশরিকদের দু’ দলের কোন একটিকে আয়ত্বে আনার সুযোগ করে দিবেন। একটি ছিলো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী দল এবং তারা যে সম্পদগুলো বহন করে আনছে। তা তোমরা গনীমত তথা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসেবে গ্রহণ করবে। অন্যটি ছিলো যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত দল। যাদের সাথে যুদ্ধ করে তোমরা তাদের উপর জয়লাভ করবে। বস্তুতঃ তোমরা চাচ্ছিলে ব্যবসায়ী দলকে ধরার জন্য। কারণ, যুদ্ধ ছাড়া তাদেরকে আয়ত্ব করা খুবই সহজ। অথচ আল্লাহ তা‘আলা চাচ্ছিলেন তোমাদেরকে যুদ্ধের ময়দানে এনে সত্যকে বাস্তবায়িত করতে। যাতে তোমরা মুশরিকদের নেতাদেরকে হত্যা এবং তাদের অধিকাংশকে বন্দী করতে পারো। ফলে ইসলামের শক্তি জনসমক্ষে প্রকাশ পাবে।
لِيُحِقَّ ٱلۡحَقَّ وَيُبۡطِلَ ٱلۡبَٰطِلَ وَلَوۡ كَرِهَ ٱلۡمُجۡرِمُونَ
অর্থ: যাতে তিনি সত্যকে সত্য হিসেবে এবং বাতিলকে বাতিল হিসেবে প্রমাণিত করেন; যদিও অপরাধীরা তা অপছন্দ করে।
তাফসীর: ৮. আল্লাহ তা‘আলা তা এ জন্যই করেছেন যেন তিনি ইসলামের সত্যতার ব্যাপারে কিছু প্রমাণ দাঁড় করিয়ে ইসলাম ও মুসলিমদেরকে জনসমক্ষে প্রকাশ করে সত্যের জয় ও মিথ্যার পরাজয়কে নিশ্চিত ও প্রমাণিত করতে পারেন। যদিও মুশরিকরা এমনটি চাচ্ছে না তবুও আল্লাহ তা‘আলা তা অবশ্যই প্রকাশ করবেন।
إِذۡ تَسۡتَغِيثُونَ رَبَّكُمۡ فَٱسۡتَجَابَ لَكُمۡ أَنِّي مُمِدُّكُم بِأَلۡفٖ مِّنَ ٱلۡمَلَٰٓئِكَةِ مُرۡدِفِينَ
অর্থ: তোমরা স্মরণ করো, যখন তোমরা তোমাদের রবের নিকটে সহযোগিতার প্রার্থনা করছিলে, অতঃপর তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন যে, অবশ্যই আমি তোমাদেরকে ধারাবাহিকভাবে একের পর এক আগমনকারী এক হাজার ফিরিশতা দিয়ে সাহায্য করবো।’
তাফসীর: ৯. বদরের দিনের কথা স্মরণ করো যখন তোমরা আল্লাহর কাছ থেকে শত্রæর উপর জয়ের ব্যাপারে সহযোগিতার আবেদন করছিলে তখন আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের দু‘আ কবুল করে এ ঘোষণা দিলেন যে, হে মু’মিনরা! আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে এক হাজার ফিরিশতা দিয়ে সাহায্য ও সহযোগিতা করবেন। যারা ধারাবাহিকভাবে একের পর এক আসতে থাকবে।
وَمَا جَعَلَهُ ٱللَّهُ إِلَّا بُشۡرَىٰ وَلِتَطۡمَئِنَّ بِهِۦ قُلُوبُكُمۡۚ وَمَا ٱلنَّصۡرُ إِلَّا مِنۡ عِندِ ٱللَّهِۚ إِنَّ ٱللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ
অর্থ: আর আল্লাহ এটা করেছেন শুধু সুসংবাদ স্বরূপ এবং যাতে তোমাদের অন্তরসমূহ এর দ্বারা প্রশান্তি লাভ করে। আর সাহায্য তো শুধু আল্লাহর কাছ থেকেই আসে। নিশ্চয় আল্লাহ প্রবল পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
তাফসীর: ১০. হে মু’মিনরা! আল্লাহর পক্ষ থেকে ফিরিশতা কর্তৃক তোমাদেরকে সাহায্য করা শুধু তোমাদেরকে এ সুসংবাদ দেয়ার জন্য যে, তিনি তোমাদেরকে শত্রæর উপর বিজয়ী করবেন। আর যেন তোমাদের অন্তরগুলো সাহায্যের দৃঢ় বিশ্বাসে শান্ত হয়ে যায়। বিজয় শুধু সংখ্যাধিক্য ও প্রচুর সরঞ্জামের জন্য নয় বরং তা আল্লাহর কাছ থেকে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা নিজ ক্ষমতায় পরাক্রমশালী। তাঁকে কেউ পরাজিত করতে পারে না। তিনি তাঁর শরীয়ত ও তাক্বদীরে অত্যন্ত প্রজ্ঞাময়।
অনুবাদ: রুওয়াদ অনুবাদ সেন্টার। তাফসীর: তাফসীর সেন্টার ফর কুরআনিক স্টাডিজ। উৎস QuranEnc.