সিরাতুল মুস্তাকিম অ্যাপ ডাউনলোড করুনGoogle Play
الٓمٓ
অর্থ: আলিফ-লাম-মীম।(১)
তাফসীর: ১. الـم এ বিচ্ছিন্ন অক্ষরগুলো সূরা বাকারার শুরুতেও উল্লিখিত হয়েছে। তাতে এ কুর‘আনের ন্যায় আরেকটি কুর‘আন নিয়ে আসার ব্যাপারে আরবদের অক্ষমতার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। অথচ সেটি এ জাতীয় অক্ষর দিয়েই গঠিত যা দিয়ে সূরাটি শুরু করা হয়েছে। উপরন্তু তারা নিজেদের সকল কথাবার্তা ও লেখালেখি এ জাতীয় অক্ষর দিয়েই করে থাকে।
(১) এই অক্ষরগুলো এবং এর অনুরূপ অন্যান্য অক্ষরসমূহ, যা কুরআনের কিছু সূরার শুরুতে এসেছে, এগুলোকে হুরূফে মুকাত্তা‘আত তথা কতগুলো বিচ্ছিন্ন বর্ণ দ্বারা গঠিত এক-একটা বাক্য বলে। এগুলো আল-কুরআনের অলৌকিকতার প্রতি ইঙ্গিত করে। মুশরিকরা এর দ্বারা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছিল এবং তারা এর মোকাবিলা করতে অক্ষম ছিল; যদিও এগুলো আরবী ভাষার কতগুলো অক্ষর দিয়েই গঠিত। আরবদের -তারা সর্বাধিক বিশুদ্ধ বাগ্মী হওয়া সত্ত্বেও -এর অনুরূপ কিছু রচনা করতে অক্ষমতাই প্রমাণ করে যে কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত।
ٱللَّهُ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلۡحَيُّ ٱلۡقَيُّومُ
অর্থ: আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনি চিরঞ্জীব, চিরপ্রতিষ্ঠিত ধারক।
তাফসীর: ২. তিনি আল্লাহ যিনি ব্যতীত ইবাদাতের সত্যিকার উপযুক্ত আর কেউ নেই। তিনি একটি পরিপূর্ণ জীবনের অধিকারী। যাতে মৃত্যু ও কোন ধরনের ত্রæটি নেই। তিনি নিজেই প্রতিষ্ঠিত। তাঁর সকল সৃষ্টির প্রতি তিনি অমুখাপেক্ষী। বরং তাঁর মাধ্যমেই তাঁর সকল সৃষ্টি প্রতিষ্ঠিত। সর্ববস্থায় সেগুলো তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষী।
نَزَّلَ عَلَيۡكَ ٱلۡكِتَٰبَ بِٱلۡحَقِّ مُصَدِّقٗا لِّمَا بَيۡنَ يَدَيۡهِ وَأَنزَلَ ٱلتَّوۡرَىٰةَ وَٱلۡإِنجِيلَ
অর্থ: (হে নবী) তিনি সত্যসহ তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করেছেন, যা তার পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যায়নকারী। আর তিনিই নাযিল করেছেন তাওরাত ও ইনজীল(২)।
তাফসীর: ৩-৪. হে নবী! তিনিই তোমার উপর কুর‘আন নাযিল করেছেন। যার সংবাদগুলো সত্য এবং তার বিধানগুলো ইনসাফে পরিপূর্ণ। যা পূর্বের ঐশী কিতাবগুলোর সত্যতা প্রমাণ করছে। তাতে কোন ধরনের দ্ব›দ্ব নেই। তিনি তোমার উপর কুর‘আন নাযিল করার পূর্বে মূসা (আলাইহিস-সালাম) এর উপর তাওরাত এবং ‘ঈসা (আলাইহিস-সালাম) এর উপর ইঞ্জীল নাযিল করেছেন। এ সকল ঐশী কিতাব সবই হিদায়েতে পরিপূর্ণ। যা মানুষদেরকে তাদের দ্বীন ও দুনিয়ার সঠিক পথ দেখায়। পরিশেষে তিনি তোমার উপর কুর‘আন নাযিল করেছেন। যার মাধ্যমে মিথ্যা থেকে সত্য এবং ভ্রষ্টতা থেকে হিদায়েত চেনা যায়। যারা আপনার উপর নাযিলকৃত আল্লাহর আয়াতগুলোর সাথে কুফরি করে তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। বস্তুতঃ আল্লাহ তা‘আলা পরাক্রমশালী। তাঁকে কোন কিছুই পরাজিত করতে পারে না। তিনি তাঁর আদেশ অমান্যকারী ও তাঁর রাসূলদেরকে অস্বীকারকারীদের থেকে সত্যিই প্রতিশোধ গ্রহণ করে থাকেন।
(২) তিনি কুরআন নাযিল করার পূর্বে মূসা ‘আলাইহিস সালামের ওপর তাওরাত এবং ‘ঈসা ‘আলাইহিস সালামের উপর ইঞ্জীল নাযিল করেছেন।
مِن قَبۡلُ هُدٗى لِّلنَّاسِ وَأَنزَلَ ٱلۡفُرۡقَانَۗ إِنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ بِـَٔايَٰتِ ٱللَّهِ لَهُمۡ عَذَابٞ شَدِيدٞۗ وَٱللَّهُ عَزِيزٞ ذُو ٱنتِقَامٍ
অর্থ: ইতোপূর্বে মানবজাতির হিদায়াতের জন্যে। আর তিনি ফুরকান (কুরআন) নাযিল করেছেন। নিশ্চয় যারা আল্লাহর আয়াতসমূহ (৩) অস্বীকার করে, তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। আর আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, প্রতিশোধ গ্রহণকারী।
তাফসীর: ৩-৪. হে নবী! তিনিই তোমার উপর কুর‘আন নাযিল করেছেন। যার সংবাদগুলো সত্য এবং তার বিধানগুলো ইনসাফে পরিপূর্ণ। যা পূর্বের ঐশী কিতাবগুলোর সত্যতা প্রমাণ করছে। তাতে কোন ধরনের দ্ব›দ্ব নেই। তিনি তোমার উপর কুর‘আন নাযিল করার পূর্বে মূসা (আলাইহিস-সালাম) এর উপর তাওরাত এবং ‘ঈসা (আলাইহিস-সালাম) এর উপর ইঞ্জীল নাযিল করেছেন। এ সকল ঐশী কিতাব সবই হিদায়েতে পরিপূর্ণ। যা মানুষদেরকে তাদের দ্বীন ও দুনিয়ার সঠিক পথ দেখায়। পরিশেষে তিনি তোমার উপর কুর‘আন নাযিল করেছেন। যার মাধ্যমে মিথ্যা থেকে সত্য এবং ভ্রষ্টতা থেকে হিদায়েত চেনা যায়। যারা আপনার উপর নাযিলকৃত আল্লাহর আয়াতগুলোর সাথে কুফরি করে তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। বস্তুতঃ আল্লাহ তা‘আলা পরাক্রমশালী। তাঁকে কোন কিছুই পরাজিত করতে পারে না। তিনি তাঁর আদেশ অমান্যকারী ও তাঁর রাসূলদেরকে অস্বীকারকারীদের থেকে সত্যিই প্রতিশোধ গ্রহণ করে থাকেন।
(৩) মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর নাযিলকৃত আল-কুরআন অস্বীকার করবে।
إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَخۡفَىٰ عَلَيۡهِ شَيۡءٞ فِي ٱلۡأَرۡضِ وَلَا فِي ٱلسَّمَآءِ
অর্থ: নিশ্চয় আল্লাহর কাছে আসমান ও জমিনের কোনো কিছুই গোপন থাকে না।(৪)
তাফসীর: ৫. পৃথিবী ও আকাশের কোন কিছুই আল্লাহর নিকট গোপন নয়। তাঁর জ্ঞান প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সব কিছুকেই বেষ্টন করে আছে।
(৪) কারণ তাঁর জ্ঞান প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সব কিছুকেই বেষ্টন করে আছে।
هُوَ ٱلَّذِي يُصَوِّرُكُمۡ فِي ٱلۡأَرۡحَامِ كَيۡفَ يَشَآءُۚ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡحَكِيمُ
অর্থ: তিনিই সেই সত্তা, যিনি মাতৃগর্ভে যেভাবে ইচ্ছে তোমাদের আকৃতি গঠন করেন।(৫) তিনি ছাড়া অন্য কোনো সত্য ইলাহনেই; তিনি প্রবল পরাক্রমশালী, মহা প্রজ্ঞাময়।
তাফসীর: ৬. তিনি তোমাদেরকে তোমাদের মায়ের পেটে যেভাবে চেয়েছেন সেভাবে তথা বিভিন্ন আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন। যেমন: পুরুষ-মহিলা, সুন্দর-অসুন্দর ও সাদা-কালো ইত্যাদি। তিনি ছাড়া সত্য কোন মা’বূদ নেই। তিনি পরাক্রমশালী ও অপরাজেয়। সৃষ্টি, পরিচালনা ও শরীয়তের বিধান রচনার ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত প্রজ্ঞাময়।
(৫) যেমন: পুরুষ-মহিলা, সুন্দর-অসুন্দর ও সাদা-কালো ইত্যাদি।
هُوَ ٱلَّذِيٓ أَنزَلَ عَلَيۡكَ ٱلۡكِتَٰبَ مِنۡهُ ءَايَٰتٞ مُّحۡكَمَٰتٌ هُنَّ أُمُّ ٱلۡكِتَٰبِ وَأُخَرُ مُتَشَٰبِهَٰتٞۖ فَأَمَّا ٱلَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمۡ زَيۡغٞ فَيَتَّبِعُونَ مَا تَشَٰبَهَ مِنۡهُ ٱبۡتِغَآءَ ٱلۡفِتۡنَةِ وَٱبۡتِغَآءَ تَأۡوِيلِهِۦۖ وَمَا يَعۡلَمُ تَأۡوِيلَهُۥٓ إِلَّا ٱللَّهُۗ وَٱلرَّٰسِخُونَ فِي ٱلۡعِلۡمِ يَقُولُونَ ءَامَنَّا بِهِۦ كُلّٞ مِّنۡ عِندِ رَبِّنَاۗ وَمَا يَذَّكَّرُ إِلَّآ أُوْلُواْ ٱلۡأَلۡبَٰبِ
অর্থ: তিনিই তোমার প্রতি এই কিতাব নাযিল করেছেন যার কিছু আয়াত ‘মুহ্কাম’ (সুস্পষ্ট আয়াত), এগুলো কিতাবের মূল; আর অন্যগুলো ‘মুতাশাবিহ্’ (অস্পষ্ট ও একাধিক অর্থবহ )। সুতরাং যাদের অন্তরে বক্রতা রয়েছে শুধু তারাই ফেৎনা এবং ভুল ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে মুতাশাবিহাতের অনুসরণ করে। অথচ আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ এ আয়াতগুলোর ব্যাখ্যা জানে না। আর যারা জ্ঞানে পরিপক্ব (আলেম) তারা বলে, ‘আমরা এগুলোতে ঈমান রাখি, সবই আমাদের রবের কাছ থেকে অবতীর্ণ’। আসলেজ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন লোকেরা ব্যতীত আর কেউ উপদেশ গ্রহণ করে না।
তাফসীর: ৭. হে নবী! তিনি তোমার উপর কুর‘আন নাযিল করেছেন। তাতে রয়েছে সুস্পষ্ট অর্থ বিশিষ্ট আয়াতসমূহ। যা একেবারেই দ্ব্যর্থহীন। সেগুলো হলো কুর‘আনের মূল এবং সেগুলোই বেশিরভাগ। সমস্যার সমাধানে সেগুলোর দিকেই ফিরে যেতে হবে। আর কিছু আয়াত আছে যা দ্ব্যর্থবোধক এবং একাধিক অর্থের সম্ভাবনাময়। এসবের অর্থ অধিকাংশ মানুষের নিকটই অস্পষ্ট। সুতরাং যার অন্তরে সত্য থেকে দূরে সরে যাওয়ার ঝোঁক আছে সেই দ্ব্যর্থহীন আয়াতগুলোকে ছেড়ে দ্ব্যর্থবোধক আয়াতগুলোকে গ্রহণ করে। বস্তুতঃ তারা এরই মাধ্যমে মানুষের মাঝে সন্দেহ সৃষ্টি করে তাদেরকে পথভ্রষ্ট করতে চায়। তারা নিজেদের বাতিল মতাদর্শের পক্ষে আয়াতগুলোর মনগড়া ব্যাখ্যা দিতে চায়। অথচ এ আয়াতগুলোর সঠিক অর্থ ও ব্যাখ্যা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই ভালো জানেন। আর যারা জ্ঞানে পরিপক্ক অভিজ্ঞ আলিম তারা বলে: আমরা পুরো কুর‘আনের উপরই ঈমান এনেছি। কারণ, এসবগুলো সত্যিই আমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে এসেছে। তারা দ্ব্যর্থহীন আয়াত অনুযায়ী দ্ব্যর্থবোধক আয়াতের ব্যাখ্যা দিয়ে থাকে। মূলতঃ সঠিক মেধা সম্পন্ন ব্যক্তি ছাড়া আর কেউই উপদেশ গ্রহণ করতে চায় না।
رَبَّنَا لَا تُزِغۡ قُلُوبَنَا بَعۡدَ إِذۡ هَدَيۡتَنَا وَهَبۡ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحۡمَةًۚ إِنَّكَ أَنتَ ٱلۡوَهَّابُ
অর্থ: হে আমাদের রব, আপনি হিদায়াত দেওয়ার পর আমাদের অন্তরসমূহ বক্র করবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদেরকে রহমত দান করুন। নিশ্চয় আপনি মহান দাতা।
তাফসীর: ৮. জ্ঞানে পরিপক্ক ব্যক্তিরা বলেন: হে আমাদের প্রভু! আপনি আমাদের অন্তরগুলোকে হিদায়েত দানের পর তা থেকে সরিয়ে দিবেন না। আপনি আমাদেরকে সত্য পরিপন্থী লোকদের পরিণতি থেকে রক্ষা করুন। আপনি আমাদেরকে আপনার পক্ষ থেকে সার্বিকভাবে দয়া করুন। আমাদের অন্তরগুলোকে সঠিক পথ দেখান ও ভ্রষ্টতা থেকে রক্ষা করুন। হে প্রভু! নিশ্চয়ই আপনি অসীম দাতা ও পরম দয়ালু।
رَبَّنَآ إِنَّكَ جَامِعُ ٱلنَّاسِ لِيَوۡمٖ لَّا رَيۡبَ فِيهِۚ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يُخۡلِفُ ٱلۡمِيعَادَ
অর্থ: হে আমাদের রব! নিশ্চয় আপনি সমস্ত মানুষকে একদিন সমবেত করবেন, যার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। নিশ্চয় আল্লাহ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না।
তাফসীর: ৯. হে আমাদের প্রভু! নিশ্চয়ই আপনি সকল মানুষকে হিসাবের জন্য এমন এক দিন একত্র করবেন যা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। সেটি সত্যিই একটি অনিবার্য বিষয়। হে প্রভু! নিশ্চয়ই আপনি কখনো ওয়াদা ভঙ্গ করেন না।
إِنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ لَن تُغۡنِيَ عَنۡهُمۡ أَمۡوَٰلُهُمۡ وَلَآ أَوۡلَٰدُهُم مِّنَ ٱللَّهِ شَيۡـٔٗاۖ وَأُوْلَٰٓئِكَ هُمۡ وَقُودُ ٱلنَّارِ
অর্থ: নিশ্চয় যারা কুফরী করে, আল্লাহর নিকট তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো কাজে আসবে না। আর তারা হবে জাহান্নামের জ্বালানি।
তাফসীর: ১০. নিশ্চয়ই যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের সাথে কুফরি করেছে তাদের সন্তান-সন্ততি ও ধন-সম্পদ দুনিয়া ও আখিরাতের কোথাও আল্লাহর শাস্তি থেকে তাদেরকে রক্ষা করতে পারবে না। মূলতঃ যারা এ সকল বৈশিষ্ট্যের অধিকারী তারা জাহান্নামের ইন্ধন মাত্র। যার মাধ্যমে কিয়ামতের দিন জাহান্নামের আগুনকে প্রজ্জলিত করা হবে।
অনুবাদ: রুওয়াদ অনুবাদ সেন্টার। তাফসীর: তাফসীর সেন্টার ফর কুরআনিক স্টাডিজ। উৎস QuranEnc.