সিরাতুল মুস্তাকিম অ্যাপ ডাউনলোড করুনGoogle Play
حمٓ
অর্থ: হা-মীম।(১)
তাফসীর: ১. হা-মীম, এসব বিচ্ছিন্ন অক্ষরের অর্থ সংক্রান্ত আলোচনা সূরা বাকারার শুরুতেই অতিক্রান্ত হয়েছে।
(১) এই অক্ষরগুলো এবং এর অনুরূপ অন্যান্য অক্ষরসমূহ, যা কুরআনের কিছু সূরার শুরুতে এসেছে, এগুলোকে আল-হুরূফুল মুকাত্তা‘আত তথা কতগুলো বিচ্ছিন্ন বর্ণ দ্বারা গঠিত এক-একটা বাক্য বলে। এগুলো আল-কুরআনের অলৌকিকতার প্রতি ইঙ্গিত করে। মুশরিকরা এর দ্বারা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছিল এবং তারা এর মোকাবিলা করতে অক্ষম ছিল; যদিও এগুলো আরবী ভাষার কতগুলো অক্ষর দিয়েই গঠিত। আরবদের – তারা সর্বাধিক বিশুদ্ধ বাগ্মী হওয়া সত্ত্বেও - এর অনুরূপ কিছু রচনা করতে অক্ষমতাই প্রমাণ করে যে কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত।
تَنزِيلُ ٱلۡكِتَٰبِ مِنَ ٱللَّهِ ٱلۡعَزِيزِ ٱلۡعَلِيمِ
অর্থ: এই কিতাব তথা আল কুরআন মহাপরাক্রমশালী সর্বজ্ঞানী আল্লাহর পক্ষ থেকে (২) অবতীর্ণ।
তাফসীর: ২. এই কুরআন সেই আল্লাহর পক্ষ থেকে তদীয় রাসূল মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়াসাল্লাম) এর উপর অবতীর্ণ। যিনি পরাক্রমশালী; তাঁকে কেউ পরাস্ত করতে পারে না। যিনি স্বীয় বান্দাদের ভালো-মন্দ সম্পর্কে সম্যক অবগত।
(২) মুহাম্মাদ (সা) - এর উপর।
غَافِرِ ٱلذَّنۢبِ وَقَابِلِ ٱلتَّوۡبِ شَدِيدِ ٱلۡعِقَابِ ذِي ٱلطَّوۡلِۖ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَۖ إِلَيۡهِ ٱلۡمَصِيرُ
অর্থ: আল্লাহ পাপ ক্ষমাকারী, তাওবা কবুলকারী, কঠোর শাস্তিদাতা, মহা অনুকম্পাকারী। তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। তাঁর কাছেই (৩) প্রত্যাবর্তন।
তাফসীর: ৩. তিনি পাপীদের পাপ মার্জনাকারী। তিনি তাঁর তাওবাকারী বান্দাদের তাওবা কবুলকারী। পক্ষান্তরে যে স্বীয় পাপ থেকে তাওবা করে না তার জন্য তিনি কঠিন শাস্তিদাতা। তিনি অনুগ্রহ ও অনুকম্পাকারী। তিনি ব্যতীত কোন প্রকৃত মা‘বূদ নেই। কিয়ামত দিবসে বান্দারা কেবল তাঁর নিকটই প্রত্যাবর্তন করবে। ফলে তিনি তাদেরকে প্রাপ্য অনুযায়ী প্রতিদান দিবেন।
(৩) কিয়ামত দিবসে বান্দাহদের।
مَا يُجَٰدِلُ فِيٓ ءَايَٰتِ ٱللَّهِ إِلَّا ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ فَلَا يَغۡرُرۡكَ تَقَلُّبُهُمۡ فِي ٱلۡبِلَٰدِ
অর্থ: কাফিররাই কেবল আল্লাহর আয়াতসমূহ নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হয়। সুতরাং দেশে দেশে তাদের অবাধ বিচরণ(৪) যেন তোমাকে ধোঁকায় না ফেলে।
তাফসীর: ৪. আল্লাহর একত্ববাদ ও তদীয় রাসূলদের সত্যতার উপর প্রমাণ বহনকারী আয়াতসমূহ নিয়ে কেবল কাফির সম্প্রদায়ই তাদের বিবেক বিকৃতির দরুন ঝগড়ায় লিপ্ত হতে পারে। আপনি তাদেরকে নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবেন না। আর তাদের জিবীকার প্রাচুর্য যেন আপনাকে প্রতারিত না করে। কারণ, তাদেরকে অবকাশ দেয়া মূলতঃ তাদেরকে ধরার ফাঁদ ও দুরভিসন্ধি মাত্র।
(৪) অর্থাৎ কাফিরদের জীবিকার প্রাচুর্য যেন তোমাকে প্রতারিত না করে।
كَذَّبَتۡ قَبۡلَهُمۡ قَوۡمُ نُوحٖ وَٱلۡأَحۡزَابُ مِنۢ بَعۡدِهِمۡۖ وَهَمَّتۡ كُلُّ أُمَّةِۭ بِرَسُولِهِمۡ لِيَأۡخُذُوهُۖ وَجَٰدَلُواْ بِٱلۡبَٰطِلِ لِيُدۡحِضُواْ بِهِ ٱلۡحَقَّ فَأَخَذۡتُهُمۡۖ فَكَيۡفَ كَانَ عِقَابِ
অর্থ: তাদের পূর্বে নূহের জাতি এবং তাদের পরেও অনেক দল মিথ্যারোপ করেছিল।(৫) প্রত্যেক জাতিই স্বীয় রাসূলকে পাকড়াও করার সংকল্প করেছিল এবং সত্যকে বিদূরিত করার উদ্দেশ্যে তারা বাতিলের পক্ষে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিল। ফলে আমিও তাদেরকে (শাস্তি দ্বারা) পাকড়াও করলাম। সুতরাং, ভেবে দেখো, কেমন ছিল আমার শাস্তি!
তাফসীর: ৫. এদের পূর্বে নূহ (আলাইহিস-সালাম) এর জাতি মিথ্যারোপ করেছে এবং এদের পূর্বে ও পরে বহু জাতি মিথ্যারোপ করেছে। তেমনিভাবে ‘আদ, সামূদ, লূত্ব জাতি ও মাদায়েনবাসী এবং ফিরআউন মিথ্যারোপ করেছে। প্রত্যেক জাতি মনস্ত করেছে যে, স্বীয় রাসূলকে ধরে হত্যা করবে। তারা বাতিলের পক্ষে তর্ক করছে যেন তারা সত্যকে প্রতিহত করতে পারে। ফলে আমি সে সব জাতিকে পাকড়াও করেছি। অতএব, আপনি গভীরভাবে ভেবে দেখুন, তাদের জন্য আমার শাস্তি কেমন ছিলো। বস্তুতঃ সেটি ছিল কঠিন শাস্তি।
(৫) নবীদেরকে মিথ্যারোপকারী জাতি যেমন: ‘আদ, সামূদ, লূত জাতি ও মাদায়িনবাসী এবং ফিরআউন ও তার জাতি তাদের নবীদেরকে মিথ্যারোপ করেছে।
وَكَذَٰلِكَ حَقَّتۡ كَلِمَتُ رَبِّكَ عَلَى ٱلَّذِينَ كَفَرُوٓاْ أَنَّهُمۡ أَصۡحَٰبُ ٱلنَّارِ
অর্থ: আর (৬) এভাবেই কাফিরদের (ধ্বংসের) ক্ষেত্রে তোমার রবের বাণী সত্যে পরিণত হল যে, নিশ্চয় এরা জাহান্নামী।
তাফসীর: ৬. আল্লাহ যেভাবে এ সব মিথ্যারোপকারী জাতিকে ধ্বংস করার ফয়সালা করেন হে রাসূল! তেমনিভাবে তাদের জন্য এ কথাও অবধারিত করে দিয়েছেন যে, যারা কুফরী করেছে তারা জাহান্নামবাসী হবে।
(৬) যেভাবে আল্লাহ এ সব মিথ্যারোপকারী জাতিকে ধ্বংস করার ফয়সালা করেন,
ٱلَّذِينَ يَحۡمِلُونَ ٱلۡعَرۡشَ وَمَنۡ حَوۡلَهُۥ يُسَبِّحُونَ بِحَمۡدِ رَبِّهِمۡ وَيُؤۡمِنُونَ بِهِۦ وَيَسۡتَغۡفِرُونَ لِلَّذِينَ ءَامَنُواْۖ رَبَّنَا وَسِعۡتَ كُلَّ شَيۡءٖ رَّحۡمَةٗ وَعِلۡمٗا فَٱغۡفِرۡ لِلَّذِينَ تَابُواْ وَٱتَّبَعُواْ سَبِيلَكَ وَقِهِمۡ عَذَابَ ٱلۡجَحِيمِ
অর্থ: যারা (৭) আরশ বহন করে এবং যারা এর চারপাশে রয়েছে, তারা তাদের রবের প্রশংসাসহ তাসবীহ পাঠ করে এবং তাঁর প্রতি ঈমান রাখে। আর মু’মিনদের জন্য ক্ষমার দু‘আ করে বলে: ‘হে আমাদের রব! আপনি রহমত ও জ্ঞান দ্বারা সব কিছুকে পরিব্যপ্ত করে রয়েছেন। অতএব যারা তাওবা করে এবং আপনার পথ অনুসরণ করে আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিন। আর তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে আপনি রক্ষা করুন।’ (৭) যেসব ফিরিশতারা।
তাফসীর: ৭. হে রাসূল! যে সব ফিরিশতা আপনার প্রতিপালকের আরশ বহন করে আর যারা তার আশপাশে রয়েছে তাঁরা স্বীয় প্রতিপালকের পবিত্রতা বর্ণনা করছে এমন সব গুণ থেকে যেগুলো তাঁর সাথে বেমানান। তাঁরা আল্লাহর উপর ঈমান আনয়নকারী ও তাঁর উপর বিশ্বাস স্থাপনকারীদের জন্য এই বলে ক্ষমার দু‘আ করে যে, হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার জ্ঞান ও রহমত সব কিছুকে পরিব্যাপ্ত করে আছে। তাই আপনি স্বীয় পাপ থেকে তাওবাকারী ও আপনার পথ অবলম্বনকারীদেরকে ক্ষমা করুন। আর তাদেরকে আগুনের স্পর্শ থেকে রক্ষা করুন।
رَبَّنَا وَأَدۡخِلۡهُمۡ جَنَّٰتِ عَدۡنٍ ٱلَّتِي وَعَدتَّهُمۡ وَمَن صَلَحَ مِنۡ ءَابَآئِهِمۡ وَأَزۡوَٰجِهِمۡ وَذُرِّيَّٰتِهِمۡۚ إِنَّكَ أَنتَ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡحَكِيمُ
অর্থ: (৮) ‘হে আমাদের রব! আর আপনি তাদেরকে চিরস্থায়ী জান্নাতে প্রবেশ করান, যার ওয়াদা আপনি তাদেরকে দিয়েছেন। আর তাদের পিতা-মাতা, পতি-পত্নী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে যারা সৎকর্ম সম্পাদন করেছে তাদেরকেও জান্নাতে প্রবেশ করান। নিশ্চয় আপনি মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’
তাফসীর: ৮. আর ফিরিশতাগণ বলেন: হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি মুমিনদেরকে প্রতিশ্রæত স্থায়ী জান্নাতে প্রবিষ্ট করুন। আরো প্রবিষ্ট করুন উত্তম আমলকারীদের পিতা-মাতা ও স্ত্রী-সন্তানদেরকে। অবশ্যই আপনি প্ররাক্রমশালী; যাঁকে কেউ প্ররাস্ত করতে পারে না। আপনি স্বীয় কর্ম বিধান ও পরিচালনায় প্রজ্ঞাবান।
(৮) ফিরিশতাগণ আরও বলেন:
وَقِهِمُ ٱلسَّيِّـَٔاتِۚ وَمَن تَقِ ٱلسَّيِّـَٔاتِ يَوۡمَئِذٖ فَقَدۡ رَحِمۡتَهُۥۚ وَذَٰلِكَ هُوَ ٱلۡفَوۡزُ ٱلۡعَظِيمُ
অর্থ: আর তাদেরকে (সেদিনের) সব অকল্যাণ থেকে রক্ষা করুন। আর সেদিন আপনি যাকে অকল্যাণ থেকে রক্ষা করবেন, তাকে তো আপনি অবশ্যই অনুগ্রহ করবেন। আর এটাই হলো (৯)মহাসাফল্য।
তাফসীর: ৯. আর তাদেরকে তাদের মন্দ আমল থেকে হেফাজত করুন এবং এর জন্য তাদেরকে শাস্তি দিবেন না। বস্তুতঃ আপনি যাকে কিয়ামত দিবসে তার মন্দ আমলের শাস্তি থেকে রক্ষা করবেন তাকে অবশ্যই আপনি দয়া করেছেন। এই শাস্তি থেকে মুক্তি ও জান্নাতে প্রবেশ হলো এমন সফলতা যার সাথে কোন সফলতার তুলনা হয় না।
(৯) এই শাস্তি থেকে মুক্তি ও জান্নাতে প্রবেশ হলো।
إِنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ يُنَادَوۡنَ لَمَقۡتُ ٱللَّهِ أَكۡبَرُ مِن مَّقۡتِكُمۡ أَنفُسَكُمۡ إِذۡ تُدۡعَوۡنَ إِلَى ٱلۡإِيمَٰنِ فَتَكۡفُرُونَ
অর্থ: নিশ্চয় যারা কুফরি করেছে, তাদেরকে (কিয়ামতের দিন) উচ্চস্বরে ডেকে বলা হবে, ‘আজ তোমরা নিজেদের প্রতি যতটা ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত, আল্লাহর অসন্তোষ তার চেয়েও অনেক বেশি ছিল, যখন তোমাদেরকে ঈমানের দিকে আহ্বান করা হয়েছিল, অথচ তোমরা কুফরি করেছিলে।’
তাফসীর: ১০. যারা আল্লাহ ও তদীয় রাসূলদেরকে অবিশ্বাস করেছে তারা কিয়ামত দিবসে যখন জাহান্নামে প্রবেশ করবে এবং স্বীয় আত্মার উপর ঘৃণা বর্ষণ পূর্বক তাকে অভিশাপ দিতে থাকবে তখন তাদেরকে ডেকে বলা হবে, তোমাদের নিজেদের উপর নিজেদের ঘৃণা যতো তার চেয়ে সমধিক ঘৃণা আল্লাহর। কারণ, দুনিয়াতে তোমাদেরকে আল্লাহর উপর ঈমান আনতে আহŸান করা হয়েছিলো। কিন্তু তোমরা তা অস্বীকর করে তাঁর সাথে অন্যদেরকে শরীক করেছিলে।
অনুবাদ: রুওয়াদ অনুবাদ সেন্টার। তাফসীর: তাফসীর সেন্টার ফর কুরআনিক স্টাডিজ। উৎস QuranEnc.