সিরাতুল মুস্তাকিম অ্যাপ ডাউনলোড করুনGoogle Play
الٓرۚ كِتَٰبٌ أُحۡكِمَتۡ ءَايَٰتُهُۥ ثُمَّ فُصِّلَتۡ مِن لَّدُنۡ حَكِيمٍ خَبِيرٍ
অর্থ: আলিফ-লাম-রা। এ কিতাব যার আয়াতসমূহ সুস্পষ্ট, সুদৃঢ়, অতঃপর (১) বিশদভাবে বিবৃত, এক পরম প্রজ্ঞাময়, সবিশেষ অবহিত সত্তা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।
তাফসীর: ১. আলিফ-লাম-রা। সূরা বাকারায় এ ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। কুর‘আন এমন একটি কিতাব, যার আয়াতগুলো অর্থ ও ছন্দে পরিপূর্ণ সুবিন্যস্ত ও সূদৃঢ়। সুতরাং এতে কোন ভুল-ত্রæটি ও অসম্পূর্ণতা নেই। অতঃপর তাতে বর্ণনা হয়েছে হালাল-হারাম, আদেশ-নিষেধ, নিয়ামতের ওয়াদা, শাস্তির হুঁশিয়ারী, ঘটনাবলী ইত্যাদি। সেই মহান সত্তার পক্ষ থেকে, যিনি তাঁর ব্যবস্থাপনায় ও বিধি বিধান প্রনয়নের ক্ষেত্রে মহা কৌশলী এবং যিনি তাঁর বান্দাদের অবস্থা সম্পর্কে ও কিসে তাদের কল্যাণ সে সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত।
(১) হালাল-হারাম, আদেশ-নিষেধ, নি‘আমতের প্রতিশ্রুতি, শাস্তির হুঁশিয়ারি, ঘটনাবলি ইত্যাদি।
أَلَّا تَعۡبُدُوٓاْ إِلَّا ٱللَّهَۚ إِنَّنِي لَكُم مِّنۡهُ نَذِيرٞ وَبَشِيرٞ
অর্থ: (হে রাসূল! তুমি জানিয়ে দাও) যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারো ‘ইবাদাত করো না। নিশ্চয়ই আমি তোমাদের জন্য তাঁর পক্ষ থেকে সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা।
তাফসীর: ২. মুুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর উপর অবতীর্ণ আয়াতসমুহের বিষয়বস্তু হলো বান্দাদেরকে আল্লাহর ইবাদতের সাথে অন্য কারো ইবাদত করতে নিষেধ করা। নিশ্চয়ই আমিই ওহে মানব মÐলী! তোমাদের জন্য আল্লাহর আজাব হতে ভীতি প্রদর্শনকারী, যদি তোমরা তাঁর সাথে কুফুরী কর ও তাঁর অবাধ্যতা কর এবং আমিই তোমাদেরকে তাঁর সওয়াব সম্পর্কে সুসংবাদদাতা, যদি তোমরা তাঁর প্রতি ঈমান আন ও তাঁর শরীয়ত ভিত্তিক আমল কর।
وَأَنِ ٱسۡتَغۡفِرُواْ رَبَّكُمۡ ثُمَّ تُوبُوٓاْ إِلَيۡهِ يُمَتِّعۡكُم مَّتَٰعًا حَسَنًا إِلَىٰٓ أَجَلٖ مُّسَمّٗى وَيُؤۡتِ كُلَّ ذِي فَضۡلٖ فَضۡلَهُۥۖ وَإِن تَوَلَّوۡاْ فَإِنِّيٓ أَخَافُ عَلَيۡكُمۡ عَذَابَ يَوۡمٖ كَبِيرٍ
অর্থ: আর তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। তারপর তাঁর কাছে ফিরে আসো। (তাহলে) তিনি তোমাদেরকে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত উত্তম ভোগ-উপকরণ দিবেন এবং প্রত্যেক আনুগত্যশীলকে তাঁর আনুগত্য অনুসারে দান করবেন। আর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে নিশ্চয় আমি তোমাদের ওপর মহা দিনের (কিয়ামতের ভয়াবহ কঠিন দিনের) শাস্তির আশঙ্কা করি।
তাফসীর: ৩. ওহে মানবজাতি! তোমরা নিজেদের রবের নিকট হতে তোমাদের গুনাহ সমূহ থেকে ক্ষমা চাও এবং তাঁর হকের ক্ষেত্রে যে অবহেলা করেছ অনুশোচনার সাথে তাঁর নিকট প্রত্যাবর্তন কর। তিনি তোমাদেরকে ইহকালে মৃত্যু পর্যন্ত অতি উত্তম রিযিক দান করবেন এবং যাদের আনুগত্য ও আমলে অবদান রয়েছে তাদের প্রত্যেককে তিনি তাদের অবদানের পরিপূর্ণ প্রতিদান দিবেন যা অসম্পূর্ণ নয়। পক্ষান্তরে আমার রবের নিকট হতে যা এনেছি তোমরা যদি তার উপর ঈমান আনা থেকে বিমুখ হও, তবে নিশ্চয়ই আমি তোমাদের উপর কিয়ামতের ভয়াবহ কঠিন দিনের আযাবের ভয় পাচ্ছি।
إِلَى ٱللَّهِ مَرۡجِعُكُمۡۖ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ قَدِيرٌ
অর্থ: (কিয়ামতের দিন) আল্লাহর নিকটই তোমাদের প্রত্যাবর্তন এবং তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।
তাফসীর: ৪. ওহে মানবজাতি! কিয়ামতের দিন এক আল্লাহর প্রতিই তোমাদের প্রত্যাবর্তন। যিনি পূত-পবিত্র সকল কিছুর উপরই ক্ষমতাবান। তাকে কোন কিছুই অপারগ করতে পারে না। তথা মৃত্যুর পর তোমাদেরকে জীবিত করা এবং তোমাদের হিসাব গ্রহণ করা ও পুনরুত্থান তাঁকে কখনোই অপারগ করতে পারবে না।
أَلَآ إِنَّهُمۡ يَثۡنُونَ صُدُورَهُمۡ لِيَسۡتَخۡفُواْ مِنۡهُۚ أَلَا حِينَ يَسۡتَغۡشُونَ ثِيَابَهُمۡ يَعۡلَمُ مَا يُسِرُّونَ وَمَا يُعۡلِنُونَۚ إِنَّهُۥ عَلِيمُۢ بِذَاتِ ٱلصُّدُورِ
অর্থ: জেনে রেখো, নিশ্চয় তারা (মুশরিকরা) তাদের বুক ভাঁজ করে রাখে, যাতে তারা তার (রাসূলের) থেকে আত্মগোপন করতে পারে। জেনে রাখো, যখন তারা (মাথাগুলো ঢাকতে) নিজেদেরকে বস্ত্রে আচ্ছাদিত করে, তখন তিনি জানেন যা তারা গোপন করে এবং যা তারা প্রকাশ করে। নিশ্চয় তিনি অন্তরের গোপন বিষয় সম্পর্কে সবিশেষে অবগত।
তাফসীর: ৫. জেনে রাখুন! ওই সমস্ত মুশরিক আল্লাহর বিষয়ে অজ্ঞতাবশত: অন্তরে যে সব সন্দেহ পোষণ করে তা গোপন করার জন্য তারা নিজেদের অন্তরগুলোকে ঝুঁকিয়ে রাখে। মূলতঃ যখন তারা কাপড় দিয়ে নিজেদের মাথাগুলো ঢেকে নেয়, যা তাদের গোপন ও প্রকাশ তা সবই আল্লাহ জানেন। কেননা তিনি নিশ্চয়ই অন্তরের গোপন বিষয় সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত।
۞ وَمَا مِن دَآبَّةٖ فِي ٱلۡأَرۡضِ إِلَّا عَلَى ٱللَّهِ رِزۡقُهَا وَيَعۡلَمُ مُسۡتَقَرَّهَا وَمُسۡتَوۡدَعَهَاۚ كُلّٞ فِي كِتَٰبٖ مُّبِينٖ
অর্থ: আর জমিনে বিচরণকারী প্রতিটি প্রাণীর রিযকের দায়িত্ব আল্লাহরই এবং তিনি তাদের (পৃথিবীতে) আবাসস্থল ও সমাধিস্থল সম্পর্কে অবগত আছেন। সবকিছুই সুস্পষ্ট কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে।
তাফসীর: ৬. জমিনের বুকে বিচরণকারী এমন কোন সৃষ্টি নেই যার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহ তা‘আলা করুণাবশতঃ গ্রহণ করেন নি। তিনি পৃথিবীর মধ্যকার প্রত্যেকের অবস্থানস্থল সম্পর্কে অবহিত আছেন। অনুরূপভাবে তিনি কে কোথায় মারা যাবে প্রত্যেকের সেই মৃত্যুর স্থান সম্পর্কেও অবহিত। সুতরাং প্রত্যেক জন্তু, তাদের রিজিক, তাদের আশ্রয়স্থল ও তাদের মৃত্যুর স্থান স্পষ্ট কিতাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। আর তা হলো লাওহে মাহফ‚য।
وَهُوَ ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٖ وَكَانَ عَرۡشُهُۥ عَلَى ٱلۡمَآءِ لِيَبۡلُوَكُمۡ أَيُّكُمۡ أَحۡسَنُ عَمَلٗاۗ وَلَئِن قُلۡتَ إِنَّكُم مَّبۡعُوثُونَ مِنۢ بَعۡدِ ٱلۡمَوۡتِ لَيَقُولَنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُوٓاْ إِنۡ هَٰذَآ إِلَّا سِحۡرٞ مُّبِينٞ
অর্থ: আর তিনিই ছয় দিনে আসমানসমূহ ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। আর (এদু’টি সৃষ্টির পূর্বে) তাঁর আরশ ছিল পানির ওপর, (হে মানবজাতি!) যাতে তিনি তোমাদের মধ্যে কে আমলে সর্বোত্তম, তা পরীক্ষা করেন। আর (রাসূল!) তুমি যদি বলো: ‘নিশ্চয়ই তোমাদেরকে মৃত্যুর পর (হিসাবের জন্য) পুনরুত্থিত করা হবে’, তবে কাফিররা অবশ্যই বলবে: ‘এতো সুস্পষ্ট যাদু।’
তাফসীর: ৭. সেই পূত-পবিত্র আল্লাহ, যিনি আকাশমÐল ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং সাত দিনে সৃষ্টি করেছেন এতদুভয়ের মাঝের সব কিছু। এদু’টি সৃষ্টির পূর্বে তাঁর আরশ ছিল পানির উপর। ওহে মানবজাতি! তোমাদেরকে তিনি এ মর্মে পরীক্ষা করবেন যে, তোমাদের মাঝে কে এমন সর্বোত্তম আমলকারী, যার দ্বারা সে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে পারে, পক্ষান্তরে কে এমন সর্বাধিক মন্দআমলকারী, যার দ্বারা সে তাঁকে অসন্তুষ্ট করবে। যার ফলে তিনি তাদের প্রত্যেককে তাদের প্রাপ্য প্রতিদান দিবেন। ওহে রাসূল! যদি আপনি বলেন, ওহে মানবজাতি! নিশ্চয়ই তোমরা মৃত্যুর পর হিসাবের জন্য পুনরুত্থিত হবে। ওরা অবশ্যই বলবে, যারা আল্লাহর সাথে কুফরী করে ও পুনরুত্থানকে অস্বীকার করে: এ কুরআন স্পষ্ট যাদু ছাড়া আর কিছুই নয়, যা তুমি তেলাওয়াত কর, যা বাতিল ও স্পষ্ট ভ্রান্তিই বটে।
وَلَئِنۡ أَخَّرۡنَا عَنۡهُمُ ٱلۡعَذَابَ إِلَىٰٓ أُمَّةٖ مَّعۡدُودَةٖ لَّيَقُولُنَّ مَا يَحۡبِسُهُۥٓۗ أَلَا يَوۡمَ يَأۡتِيهِمۡ لَيۡسَ مَصۡرُوفًا عَنۡهُمۡ وَحَاقَ بِهِم مَّا كَانُواْ بِهِۦ يَسۡتَهۡزِءُونَ
অর্থ: আর আমি যদি (দুনিয়াতে) নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাদের থেকে শাস্তি বিলম্বিত করি, তবে তারা অবশ্যই বলবে: ‘কোন জিনিস তাকে (শাস্তিকে) আটকে রাখল? সাবধান! যেদিন সেটি (শাস্তি) তাদের ওপর নেমেই আসবে, সেদিন তাদের থেকে তা ফেরানো হবে না এবং তারা যা (শাস্তি) নিয়ে ঠাট্টা- বিদ্রুপ করত, তাদেরকে তা ঘেরাও করে ফেলবে।
তাফসীর: ৮. আমি যদি দুনিয়ার জীবনে মুশরিকদের থেকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাদের প্রাপ্য আযাব বিলম্বিত করি, তখন তারা অবশ্যই বিদ্রƒপ করে তাড়াহুড়া করে বলবে: কিসে আমাদের থেকে আযাব আটকে রাখল? সাবধান! নিশ্চয়ই তাদের সেই প্রাপ্য আযাব আল্লাহর নিকটে। আর যে দিন তাদের উপর আসবে সে দিন তাদের থেকে ফিরিয়ে দেয়ার কাউকে পাবে না, বরং তাদের উপর তা পতিত হবেই। আর যে আযাব নিয়ে তারা ঠাট্টা-বিদ্রƒপ করে তাড়াহুড়া করছিল তা তাদেরকে ঘিরে ফেলবেই।
وَلَئِنۡ أَذَقۡنَا ٱلۡإِنسَٰنَ مِنَّا رَحۡمَةٗ ثُمَّ نَزَعۡنَٰهَا مِنۡهُ إِنَّهُۥ لَيَـُٔوسٞ كَفُورٞ
অর্থ: আর যদি আমি মানুষকে আমার পক্ষ থেকে রহমত(২) আস্বাদন করাই, অতঃপর তার থেকে তা ছিনিয়ে নেই, নিশ্চয় তখন সে হয়ে পড়ে হতাশ ও অকৃতজ্ঞ।
তাফসীর: ৯. আমি যদি মানুষকে আমার পক্ষ থেকে কোন নিয়ামত দান করি যেমন: সুস্বাস্থ্য ও ধনাঢ্যতা, অতঃপর উক্ত নিয়ামত তার থেকে ছিনিয়ে নেই, নিশ্চয়ই তখন সে আল্লাহর রহমত থেকে বড় হতাশ হয়ে যায় এবং আল্লাহর নিয়ামতের বড় অকৃতজ্ঞ হয়ে পড়ে। যখন আল্লাহ তার থেকে উক্ত নিয়ামত ছিনিয়ে নেয় তখন সে তা ভুলে যায়।
(২) যে কোন নি‘আমত, যেমন: সুস্বাস্থ্য ও ধনাঢ্য, ইত্যাদি।
وَلَئِنۡ أَذَقۡنَٰهُ نَعۡمَآءَ بَعۡدَ ضَرَّآءَ مَسَّتۡهُ لَيَقُولَنَّ ذَهَبَ ٱلسَّيِّـَٔاتُ عَنِّيٓۚ إِنَّهُۥ لَفَرِحٞ فَخُورٌ
অর্থ: আর দুঃখ-দুর্দশা স্পর্শ করার পর আমি যদি তাকে নি‘আমত আস্বাদন(৩) করাই, তাহলে সে অবশ্যই বলবে: ‘আমার থেকে বিপদ-আপদ দূর হয়ে গেছে, আর সে হয় অতি উৎফুল্ল, অহংকারী।
তাফসীর: ১০. আর যদি তার দরিদ্রতা ও অসুস্থতার পর তাকে রিযিকের প্রশস্ততা ও সুস্বাস্থ্যের স্বাদ আস্বাদন করাই তখন অবশ্যই সে বলবে: আমার দূরবস্থা ও কষ্ট কেটে গেছে, কিন্তু সে তাতে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করে না। নিশ্চয়ই সে অহংকারবশত: অনেক ফুর্তি করে এবং আল্লাহ তাকে যে নিয়ামত দান করেছেন তার দ্বারা সে মানুষের উপর অনেক গর্ব ও অহংকার প্রকাশ করে।
(৩) যেমন: দরিদ্রতা ও অসুস্থতার পর রিযকের প্রশস্ততা ও সুস্বাস্থ্য, ইত্যাদি।
অনুবাদ: রুওয়াদ অনুবাদ সেন্টার। তাফসীর: তাফসীর সেন্টার ফর কুরআনিক স্টাডিজ। উৎস QuranEnc.